তেলাকুচা পাতার উপকারিতা

তেলাকুচা (বৈজ্ঞানিক নাম: Coccinia grandis) হচ্ছে কিউকারবিটাসি (শসা লাউ) পরিবারের সিট্রালাস গণের একটি বহুবর্ষজীবী আরোহী বীরুৎ।[১] বনজ আরোহি এই লতাগাছটির অনেকগুলো নাম রয়েছে, সেসব হচ্ছে কুচিলা, তেলা, তেলাকচু, তেলাহচি, তেলাচোরা, কেলাকচু, তেলাকুচা, বিম্বী, কাকিঝিঙ্গা, কাওয়ালুলি, কান্দুরি, কুচিলা ও মাকাল। নিম্নে তেলাকুচার ভেষজ বা লোকায়তিক ব্যবহার উল্লেখ করা হলো। তেলাকুচার দৈহিক গঠন সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে আরো পড়ুন:

তেলাকুচা বাংলাদেশ ভারতের সুলভ ঔষধি লতা
১. সর্দিতে: ঋতু পরিবর্তনের যে সর্দি হয়, সেই সর্দিকে প্রতিহত করতে পারে, যদি তেলাকুচা পাতা ও মূলের রস ৪/৫ চা-চামচ একটু গরম করে সকালে ও বিকালে খাওয়া যায়; তা হলে এর দ্বারা আগন্তুক শ্লেষ্মা আক্রমণের ভয় থাকে না, তবে পাতার ওজনের সিকি পরিমাণ মূল নিলেই চলে।

২. অধগত রক্তপিত্তে: জ্বালা যন্ত্রণা থাকে না কিন্তু টাটকা রক্ত পড়ে, অর্শের কোনো লক্ষণই বোঝা যায়নি; এক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩ চা-চামচ গরম করে খেলে ঐ রক্তপড়া ২/৩ দিনের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যাবে।

৩. আমাশয় শোথে: যাঁদের আমাশা প্রায়ই লেগে থাকে, পা ঝুলিয়ে রাখলেই ফুলে যায়, এক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩/৪ চা চামচ প্রতিদিন একবার করে খেলে ঐ ফুলোটা চলে যাবে। তবে মূলরোগ আমাশার চিকিৎসা না করলে পা ফুলো আবার আসবে।

৪. পান্ডু রোগে: (শ্লেষ্মা জন্য) এইরূপ ক্ষেত্রে এর মূলের রস ২/৩ চা চামচ, গরম না করেই সকালের দিকে একবার খেতে হবে।

৫. শ্লেষ্মার জন্য জ্বর: এইসব জ্বরে তেলাকুচা পাতা ও মূল একসঙ্গে থেতো করে ২/৩ চা চামচ রস একটু গরম করে সকালে ও বিকালে ২ বার করে দুই দিন খেলে জ্বর ছেড়ে যায়। এ জ্বরে সাধারণতঃ মুখে খুবই অরুচি, এমনকি জ্বরঠুঁটোও বেরোয়, আবার কারোর মুখে ঘাও হয়।

৬. হাঁপানির মত হলে: আসলে বুকে সার্দি বসে গিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে, পূর্বে বংশপরম্পরায় হাঁপানি বা একজিমা অথবা হাতের তালু ও পায়ের তলায় অস্বাভাবিক ঘাম হওয়ার ইতিহাস নেই, এইরকম যে-ক্ষেত্রে, সেখানে এই তেলাকুচোর পাতা ও তার সিকিভাগ মূল একসঙ্গে থেতো করে তার রস ৩/৪ চা চামচ একটু গরম করে খেলে ঐ সর্দি তরল হয়ে যায়।

৭. শ্লেষ্মার জন্য কাশি: এই কাশিতে শ্লেষ্মা (কফ) একেবারে যে ওঠে না তা নয়, কাশতে কাশতে বমি হয়ে যায় তাও নয়, এই কাশিতে সর্দি (কফ) কিছু না কিছু ওঠে, তবে খুব কষ্ট হয়। এই রকম ক্ষেত্রে মূল ও পাতার রস ৩/৪ চা-চামচ একটু গরম করে, ঠান্ডা হলে আধ চা-চামচ মধু মিশিয়ে (সম্ভব হলে) খেলে ঐ শ্লেষ্মা তরল হয়ে যায় ও কাশিও উপশম হয়।

৮. জ্বর ভাব: জ্বর যে হবে তার সব লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, মাথা ভার, সারা শরীরে কামড়ানি, এই অবস্থায় কাঁচা তেলাকুচা ফলের রস ১ চা চামচ একটু মধুসহ সকালে ও বিকালে ২ বার খেলে জ্বরভাবটা কেটে যাবে, তবে অনেক সময় একটু বমি হয়ে তরল সর্দিও উঠে যায়; এটাতে শরীর অনেকটা হালকা বোধ হয়। তবে যে ক্ষেত্রে এই রোগে বায়ু অনুষঙ্গী হয় সেখানে কাজ হবে না, যেখানে পিত্ত অনুষঙ্গী হয় সেখানেও কাজ হবে না; কেবল যেখানে শরীরে কফের প্রবণতা আছে, তার সঙ্গে ডায়েবেটিস, সেখানেই কাজ করবে। এ ক্ষেত্রের লক্ষণ হবে থপথপে চেহারা, কালো হলেও ফ্যাকাসে, কোমল স্থানগুলিতে ফোড়া হতে চাইবে বেশী, এদের স্বাভাবিক টান থাকে মিষ্ট রসে, এরা জলা জায়গার স্বপ্ন বেশী দেখেন। রমণের স্থায়ীত্বও নেই যে তা নয়, এই বিকার যে কেবল বৃদ্ধকালে আসবে তা নয়, সব বয়সেই আসতে পারে। এদের ক্ষেত্রে আলু খাওয়া, মিষ্টি খাওয়া, ভাত বেশী খাওয়া নিষেধ করেছেন আয়ুর্বেদের মনীষীগণ, যাঁরা বায়ু বা পিত্ত বিকৃতির সঙ্গে ডায়েবেটিস রোগে আক্রান্ত হন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সব বর্জনের খুব উপযোগিতা আছে বলে আয়ুর্বেদের মনীষীগণ মনে করেন না।

৯. বমনের প্রয়োজনে: অনেক সময় বমি করার দরকার হয়, যদি কোনো কারণে পেটে কিছু গিয়ে থাকে বা খেয়ে থাকেন — সেক্ষেত্রে তেলাকুচা পাতার রস ৫/৬ চাচামচ কাঁচাই অর্থাৎ গরম না করেই খেতে হয়, এর দ্বারা বমন হয়ে থাকে।

১০. অরুচি: যে অরুচি শ্লেষ্মাবিকারে আসে অর্থাৎ সর্দিতে মুখে অরুচি হলে তেলাকুচোর পাতা একটু সিদ্ধ করে, জলটা ফেলে দিয়ে শাকের মত রান্না করে (অবশ্য ঘি দিয়ে সাঁতলে রান্না করতে হবে) খেলে; এর দ্বারা অরুচি সেরে যাবে।

১১. ডায়বেটিস: অনেক সময় আমরা মন্তব্য করি, তেলাকুচার পাতার রস খেলাম, আমার ডায়েবেটিসে সুফল কিছুই হলো না; কিন্তু একটা বিষয়ে যোগে ভুল হয়ে গিয়েছে। এই রোগ তো আর এক রকম দোষে জন্ম নেয় না। এক্ষেত্রে তেলাকুচোর পাতা ও মূলের রস ৩ চা চামচ করে সকালে ও বিকালে একটু গরম করে খেতে হবে। এর দ্বারা ৩/৪ দিন পর থেকে শারীরিক সুস্থতা অনুভব করতে থাকবেন।

১২. স্তনে দুধহীনতায়:—মা হলেও স্তনে দুধ নেই, এদিকে শরীর ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, এক্ষেত্রে কাঁচা সবুজ তেলাকুচা ফলের রস একটু গরম করে ছেকে তা থেকে এক চা চামচ রস নিয়ে ২/৫ ফোঁটা মধু মিশিয়ে সকালে ও বিকালে ২ বার খেলে ৪/৫ দিনের মধ্যে স্তনে দুধ আসবে।

১৩. অপস্মার রোগে : এটি যদি শ্লেষ্মা জন্য হয়, তবে এ রোগের বিশিষ্ট লক্ষণ হবে রোগাক্রমণের পর থেকে ভোগকালের মধ্যে রুগী প্রস্রাব করে থাকে। এদের দাঁড়ানো বা চলাকালে কখনও রোগাক্রমণ বড় দেখা যায় না। খাওয়ার পর ঘুমন্ত অবস্থায় অথবা খুব ভোরের দিকে এদের রোগাক্রমণ হবে। এদের (এ রোগীর) মুখ দিয়ে গাঁজলা বেরোয় না। এটা যদি দীর্ঘদিন হয়ে যায় অর্থাৎ পুরাতন হলে যদিও নিরাময় হওয়া কষ্টসাধ্য, তথাপি এটা ব্যবহার করে দেখা যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে তেলাকুচোর পাতা ও মূলের রস একটু গরম করে, ছেঁকে নিয়ে ২ চা চামচ করে প্রত্যহ খেতে হবে। তবে এটা বেশ কিছুদিন খাওয়ালে আক্রমণটা যতশীঘ্র আসছিলো সেটা আর আসবে না।

তেতো তেলাকুচা: আর এক রকম তেলাকুচা আছে যার স্বাদ তেতো। তেতো তেলাকুচোর মূলের ছালের একটি বিশেষ উপকারিতা আছে। এটি জোলাপের কাজে লাগে। তেলাকুচো পাতার রস বা পাতার পুলটিস তৈরি করে লাগালে ফোঁড়া সারে। ব্রণও সারে পাতার রসে।

তেতো তেলাকুচাও মল নিঃসারণ করায়। অরুচি নাশ করে। শ্বাসের কষ্ট, কাশি ও জ্বর সারিয়ে তোলে। বমিভাব দূর করে। স্বাদে তেতো হওয়ার জন্যে খিদে বাড়িয়ে দেয়। রক্তবিকার অর্থাৎ ‘রক্তের দোষ’ শোধন করে। বমন করাবার শক্তি আছে। কফ এবং জনডিস রোগ আরোগ্য করে। এই গাছের মূল বমি করায় এবং জোলাপের কাজও করে। শোথ রোগ সারিয়ে দেয়।

তেতো তেলাকুচার মূলের চূর্ণ খাওয়ালে প্রস্রাবের সঙ্গে শ্বেত পদার্থ বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ হয়। মূলের চূর্ণ খেলে স্ত্রীরোগে উপকার হয়। যদি বিছে কামড়ায় তেতো তেলাকুচো পাতার রসের প্রলেপ দিলে জ্বালা বন্ধ হয়।

বৈজ্ঞানিকদের মতে, তেলাকুচোয় প্রভাব জননেন্দ্রিয় ও মূত্রাশয়ের ওপর বেশি। শরীর স্নিগ্ধ করে, মূত্র ও রক্তে পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। এই শ্রেণীর অন্য তরকারির মধ্যে তেলাকুচার পুষ্টিমূল্য বেশি!

তেলাকুচোকে সংস্কৃত ভাষায় বলা হয় ‘বিম্বফল’। তেলাকুচো পাকলে টুকটুকে লাল হয়ে যায়। সেই পাকা বিম্ব-র সঙ্গে কবি কালিদাস সুন্দরীদের ঠোঁটের তুলনা করেছেন ‘পক্কবিম্বাধরোষ্ঠী’।

সতর্কীকরণ: ঘরে প্রস্তুতকৃত যে কোনো ভেষজ ওষুধ নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করুন।

তথ্যসূত্রঃ

১. এম অলিউর রহমান, (আগস্ট ২০১০)। “অ্যানজিওস্পার্মস ডাইকটিলিডনস” আহমেদ, জিয়া উদ্দিন; হাসান, মো আবুল; বেগম, জেড এন তাহমিদা; খন্দকার মনিরুজ্জামান। বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ। ৭ (১ সংস্করণ)। ঢাকা: বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। পৃষ্ঠা ৩০৬। আইএসবিএন 984-30000-0286-0

২. আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য: চিরঞ্জীব বনৌষধি খন্ড ২, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ১৩৮৪, পৃষ্ঠা ২৬-৩১।

৩. সাধনা মুখোপাধ্যায়: সুস্থ থাকতে খাওয়া দাওয়ায় শাকসবজি মশলাপাতি, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড, কলকাতা, নতুন সংস্করণ ২০০৯-২০১০, পৃষ্ঠা,১১৩-১১৪।

Share

Recent Posts

পেট ভালো রাখতে মেনে চলুন আইবিএস ডায়েট

আপনি যদি ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য, ফোলাভাব, গ্যাসসহ হজমের লক্ষণগুলো কাটিয়ে উঠতে চান, তবে আইবিএস ডায়েট অনুসরণ করার চিন্তা করতে পারেন। কারণ,… Read More

February 3, 2024

এই শীতেও কেন শসা খাবেন?

শসার রয়েছে নানা উপকারিতা। তবে সময় বুঝে খেলে তবেই কাজে লাগবে। না হলে হিতে বিপরীতও হতে পারে। প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণের কারণে… Read More

January 24, 2024

উপকারী ভেষজ চা বানাবেন যেভাবে

ভেষজ চা চিত্তাকর্ষক পুষ্টিমান, স্বাস্থ্য-উন্নয়নকারী অ্যান্টি-অক্সিডেন্টসহ থেরাপিউটিক বৈশিষ্ট্যযুক্ত উদ্ভিদ থেকে তৈরি করা হয়। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং অসুস্থ হওয়ার… Read More

January 20, 2024

This website uses cookies.